রসুনের উপকারিতা ও আপকারিতা এবং রসুন খাওয়ার নিয়ম।

রসুন(Garlic) একটি ঝাঁঝালো সবজি এর বৈজ্ঞানিক নাম (Allium sativum) । এটি এশিয়ার দেশগুলোর খাদ্য তালিকার এক অপরিহার্য উপাদান। রসুন যেমন রান্নার মশলা হিসেবে ব্যাবহার হয় ,তেমনি কাঁচা রসুনের রয়েছে বিভিন্ন ঔষধি গুণ, প্রতিদিন পরিমিত মাত্রায় রসুন খেলে এটি আমাদের অসংখ্য অসুখ বিসুখ থেকে দূরে,। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো রসুনের উপকারিতা ও আপকারিতা, স্বাস্থ্যগুণ এবং এর অতিরিক্ত খাওয়ার কুফল সম্বন্ধে। এছাড়াও স্বাস্থ্যকর উপায়ে রসুন খাওয়ার নিয়ম এবং প্রচলিত কিছু ধারনা বিষয়ে জানবো।

রসুনের উপকারিতা পুষ্টিগুণঃ 

রসুনের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম
রসুনের উপকারিতা অপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম

পরিমিত পরিমাণে নিয়ম মেনে রসুন খাওয়ার সুফল অনেক। রসুনে রয়েছে এলিসিন নামের এক যাদুকরী উপাদান যা ক্যান্সার সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যা দূর করে।রসুনে এই উপাদানের উপস্থিতির কারনে রসুনকে সুপারফুডের তালিকাতেও স্থান দেয়। এছাড়া রসুনে রয়েছে ভিটামিন (বি১,বি২,বি৩,বি৫,বি৬,বি৯) ও সেলেনিয়াম। ক্যানসার প্রতিরোধে সেলেনিয়ামও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন সকালে কাঁচা রসুন খাওয়ার উপকারিতা হচ্ছে আপনি আপনার রক্তচাপ, এ্যাজমা ও  ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এছাড়াও রসুন আপনাকে কৃমিমুক্ত রাখতে, হাড়ের রোগ দূর করতে, শ্বাসকষ্ট দূর করতে ও যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। চলুন রসুনের স্বাস্থ্য উপকারিতা গুলো বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক-

১। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখেঃ রসুন নিয়মিত সেবন আপনার রক্তচাপ কমিয়ে আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

২। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়ঃ রসুনের মধ্যে এলিসিন নামক একটা উপাদান আছে যা আমাদের শরীরে এন্টি-ফাঙ্গাল ও এন্টি ভাইরালের ভুমিকা পালনের মাধ্যমে ক্ষতিকর ভাইরাস ও অসুখ থেকে আমাদের দূরে রাখে। নিয়মিত রসুন আমাদের সহজে ইনফেকশনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে।

৩। খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়ঃ রসুন নিয়মিত সেবন আপনাকে কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করবে। অনেকে রসুন ছেঁচে খালি পেটে প্রতিদিন সকালে খায় তাদের শরীরের LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর জন্য। এটি খালি পেটে রসুন খাওয়ার অন্যতম প্রধান উপকারিতা।

৪। শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়ঃ যারা বাইরে কাজ করে বা কারখানায় কাজ করে তারা নিঃশ্বাসের সাথে অথবা সামদ্রিক খাবার দাবারের সাথে অনেক মেটালিক অনেক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে। এইসব মেটাল আমাদের শরীরে ক্যান্সার থেকে শুরু করে অনেক রকম রোগের সৃষ্টি করে। রসুন এইসব পদার্থকে ভেঙ্গে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে।

৫। হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারীঃ রসুনে অনেক খনিজ পদার্থ আছে যা আমাদের হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

৬। ব্লাড ক্লট তৈরিতে বাঁধা দেয়ঃ বিভিন্ন কারণে আমাদের রক্ত জমাট বাঁধে, এই জমাট বাঁধা রক্তের মাত্রা যখন বেশি হয়ে যায় তখন তা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। যার ফলে আমাদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং ফুস্ফুসের বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। নিয়মিত রসুন বা রসুনের সাপ্লিমেন্ট খেলে আপনার ব্লাড ক্লট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ কমে যায়।

৭। হাঁপানি কমাতে সাহায্য করেঃ যাদের হাঁপানি আছে তারা অনেক সময় কিছু জিনিষে অনেক এলার্জেটিক হয় যেই জিনিষগুলির কাছে আসলে তাদের হাঁপানি শুরু হয়। নিয়মিত রসুন সেবন এই ধরনের এলার্জিক পদার্থের প্রতি আমাদের যে সংবেদনশীলতা তা কমাতে সাহায্য করে।

৮। চোখের জন্য উপকারিঃ নিয়মিত রসুন সেবন আপনাকে চোখের বিভিন্ন রোগ থেকেও দূরে থাকতে সাহায্য করে। রসুন সেবন আপনাকে গ্লুকোমা ও কর্নিয়ার বিভিন্ন ইনফেকশন থেকে দূরে রাখবে।

৯। লিভারের জন্য উপকারীঃ রসুন আমাদের শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিয়ে শরীরকে শুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এতে লিভারের উপ চাপ কমে এবং লিভারের কার্যক্ষমতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

১০। একজিমা কমাতে সাহায্য করেঃ একজিমা অনেক কারণে হতে পারে। বংশগত কারণ, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, এলার্জি অথবা শরীরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোন রোগ। কিন্তু যেই কারনেই হোক এটার কষ্ট থেকে রসুন আপনাকে একটু আরাম দিতে পারে। রসুন সেবনে একজিমার জন্য হওয়া চুলকানি ও খোস পাঁচরা থেকে আপনি একটু আরাম পেতে পারেন।

যৌবন ধরে রাখতে রসুনঃ

রসুনকে প্রাকৃতিক সেক্স বুস্টার বলা হয়। সেক্সে রসুনের উপকারিতা অপরিসীম। রাতে ২ কোয়া রসুন কুচি করে চিবিয়ে খেলে এনার্জি বুস্ট হয়। পুরুষের বিভিন্ন যৌন দুর্বলতা দূর করতে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন চিবিয়ে খেলে অনেক উপকার পাবেন। রসুন রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে বলে লিঙ্গ উত্থান জনিত সমস্যা দূর করে। এছাড়া কথিত আছে রসুন বীর্য ঘন করতে সহায়তা করে এবং কামোদ্দীপক হিসেবেও কার্যকর। এছাড়াও চুলপাকা রোধ করতে রসুন সহায়তা করে।

রসুনের আপকারিতাঃ

যেকোন ভাল কিছুই অতিরিক্ত খেলে সেটা ক্ষতির কারন হয়। তেমনি বেশি পরিমাণে রসুন খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই রসুনের উপকারিতা ও অপকারিতা কি এই দুইটি বিষয়ই আমাদের জানতে হবে। অপরিমিত রসুন খাওয়ার ফলে ডাইরিয়া , যকৃত এর ক্ষতি, মাথা ঘোরানো , বমি ভাব, হাইফিমা, বুকে জ্বালাপোড়া সহ বিভিন্ন প্রদাহ হয়। এখানে বিস্তারিত দেয়া হলোঃ

রসুন খান সুস্থ থাকুন।
রসুন বেশি খেলে কি ক্ষতি হয়।

দুর্গন্ধঃ রসুন খাওয়ার অন্যতম বিপত্তি হচ্ছে মুখে দুর্গন্ধ। এর প্রধান কারন রসুনে থাকা সালফার।

অতিরিক্ত ঘামঃ অনেক দিন ধরে রসুন পরিমাণে বেশি খেলে ঘামের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা আপনার জন্য সুখকর নয়।

রক্ত পাতলা হওয়াঃ রসুন রক্তের ঘনত্ব কমিয়ে রক্ত চলাচলের গতি বৃদ্ধি করে। কিন্তু যখন আপনি অতিরিক্ত রসুন খাবেন তখন রক্ত বেশি পাতলা হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া যারা রক্ত পাতলা করার অ্যাসপিরিন এবং ওয়ারফারিন জাতীয় ঔষধ সেবন করেন তাদের কোন ভাবেই বেশি পরিমাণে রসুন খাওয়া উচিত নয়।
মহিলাদের গর্ভাবস্থায় এবং পরবর্তী অবস্থায় রসুন ক্ষতিকরঃ গর্ভাবস্থায় রসুন বেশি খেলে অপকারিতা হচ্ছে যে , প্রসব বেদনার সময় ব্যাথা বেড়ে যেতে পারে, এমনকি রক্তক্ষরণও হতে পারে । যেসব মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তাদেরও কাঁচা রসুন বা অধিক পরিমাণে রসুন খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দেয়া উচিত।

লিভারের ক্ষতিঃ বেশি পরিমাণে রসুন খাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হতে পারে লিভারের সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে রসুনে থাকা এলিসিন নামক উপাদান বেশি পরিমাণে লিভারে গেলে বিষক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

ডাইরিয়াঃ রসুন কাঁচা অবস্থায় খালি পেটে ২-৩ কোয়া খেলেই উপকার বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু যাদের গ্যাসের সমস্যা আছে তাদের জন্য রসুনে থাকা সালফার ক্ষতির কারন হতে পারে। এবং পরিমাণে বেশি খেয়ে ফেললে বা গ্যাসের সমস্যা বেশি থাকলে ডাইরিয়া হতে পারে।

নারীর যৌনাঙ্গে টিস্যুর ক্ষতিঃ পুরুষের ক্ষেত্রে সেক্সে রসুনের উপকারিতা অনেক হলেও নারীদের ক্ষেত্রে যারা যৌনাঙ্গে ইস্টজনিত প্রদাহের চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের জন্য রসুন ক্ষতির কারন হতে পারে অন্যথায় অভ্যন্তরীণ টিস্যুতে অস্বস্তি হতে পারে।

চোখের রক্ত ক্ষরণঃ  অতিরিক্ত রসুন খাওয়ার ফলে চোখের কর্নিয়া ও আইরিশে অভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণ হতে পারে অর্থাৎ হাইফিমা হতে পারে। এর ফলে আপনি হারাতে পারেন দৃষ্টিশক্তি।

এলার্জিঃ সাধারণত রসুনে এলার্জি হওয়ার ঘটনা কম, তবে যাদের রসুনে এলার্জি হয় তাদের অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যে এলার্জি হতে পারে।

কাঁচা রসুন খাওয়ার নিয়মঃ

রসুন একটি প্রাকৃতিক এন্টি বায়োটিক। কাঁচা রসুন উপকারিতা অনেক, এটি শরীর ডিটক্স করতে সহায়তা করে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির জন্য কাঁচা রসুন খাওয়ার নিয়ম হচ্ছে সকাল বেলায় খালি পেটে সর্বোচ্চ ২-৩ কোয়া রসুন চিবিয়ে বা থেতলে খাওয়া । কাঁচা রসুনে থাকে অ্যলিসিন নামক উপাদান পাওয়া যায় যা রান্না করা রসুনে খুব একটা পাওয়া যায়না।

যৌবন ধরে রাখতে রসুনের উপকারিতা অপরিসীম। রসুনকে বলা হয় গরীব এর পেনিসিলিন। সেক্সে এর ক্ষেত্রে রসুনের উপকারিতা পেতে এবং এনার্জি বাড়াতে প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন গাওয়া –ঘি তে ভেজে খেতে পারেন। খাওয়ার পর গরম পানি খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায় । এছাড়া সেক্স এনার্জি বৃদ্ধির জন্য অনেকে রসুনের সাথে মধু এবং লেবুর রস মিশিয়েও খেয়ে থাকেন। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে কাঁচা রসুন কখনোই ২-৩ কোয়ার বেশি খাওয়া উচিত নয়। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তার বা ডায়টেশিয়ানের সাথে পরামর্শ করে খেতে হবে।

ওজন কমাতে রসুনের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়মঃ

ওজন কমাতে বেশি বেশি খান।
ওজন কমাতে যে নিয়ম গুলো মেনে খাবেন…

ওজন কমাতে আমারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করি। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, রসুন অনেক ধরনের উপকারের সাথে ওজন কমাতেও সাহায্য করে। ওজন কমাতে রসুন খাওয়ার নিয়ম হচ্ছে আপনাকে খালি পেটে ২ কোয়া রসুন কুচি করে পানির সাথে গিলে ফেলুন,এভাবে রসুন গিলে খেলে ওজন কমতে থাকবে।রসুন ও মধু খাওয়ার নিয়ম খুব সহজ। পেটের মেদ বা ভুড়ি কমাতে ১ চা চামচ মধুর মধ্যে ৩ কোয়া রসুন কুচি করে দিয়ে কয়েক সপ্তাহ খেয়ে দেখুন ভাল ফলাফল পাবেন। সালাদের সংগে ভেজে রসুন খেতে পারেন। ওজন কমাতে এক্সারসাইজ এবং নিয়ম মতো চলার কোন জুরি নেই। নিয়ম মেনে চললে বেশি খেয়েও ওজন কমানো যায় এই আর্টিকেলটিতে ক্লিক করে জেনে নিন।

শেষ কথাঃ

রসুন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন , রসুন খেলে কি এলার্জি হয় কিনা, উত্তর হচ্ছে- না এবং হ্যাঁ  দুটোই । একেক জন মানুষে একেকটা আলাদা খাদ্যে এলার্জি হতে পারে। তবে বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এলার্জি হয়না। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সুবিধার জন্য অনেক কিছুই দিয়েছেন প্রকৃতির মধ্যে যা ব্যবহার করে আমরা সুস্থ ও সুখী থাকতে পারি। আমাদের আর্টিকেলটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন এবং আমাদের পেজে লাইক দিবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *