নিউট্রিশন

কলা খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং কলার বিভিন্ন ব্যবহার

কলার না জানা পুষ্টিগুণ ও ক্ষতিকর দিক এবং ফলটির ব্যবহার।

কলা আমাদের অতি পরিচিত একটি  ফল। এটির সুলভ মূল্যের কারণে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ফল। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাস্থ্য রক্ষায় কলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে ত্বক ও চোখ, চুল,পা, দাঁত ইত্যাদির  যত্নেও ফলটি ব্যবহৃত হচ্ছে। কাঁচা অবস্থায় এটি সবুজ ও পাকা অবস্থায় এটি হলুদ বর্ণ ধারণ করে। বাংলাদেশ সহ ভারত এবং ভারতীয় উপমহাদেশে কলার জনপ্রিয় জাত গুলো হচ্ছে- সাগর কলা , চাপা কলা, আনাজি কলা, সবরি কলা এবং বিচি কলা। একেক জাতের ফল মানে এবং স্বাদে একেক রকম। কিন্তু সব জাতের কলাতেই কিছু উপাদান বিদ্যমান। 

আসুন জেনে নিই কলার বিভিন্ন পুষ্টিগুণ গুলো-

 কলার উপকারিতা

পটাশিয়ামঃ কলায় আছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম যা আমাদের হৃদপিণ্ড কে সুরক্ষিত রাখে। কলা খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে তাই প্রতিদিন হৃদরোগীদের একটি করে কলা খাওয়া  খুব উপকারী। এটি খুব অল্প পরিমাণে গ্রহণ করতে  হবে।এছাড়া পটাশিয়াম রক্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।জরিপে দেখা গিয়েছে, দিন দুটি কলা গ্রহণ করলে রক্তচাপ প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়।

কলার ছবি
কলার উপকারিতা ও অপকারিতা


পটাশিয়াম আমাদের হাড়ের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এটি অস্টিওপরোসিস এর সমস্যা দূরীকরণ করে। মেয়েদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় মাসিকের সময় পটাশিয়াম উপাদানটি তলপেটের ব্যথা কমায়। জরায়ুর পেশিগুলোকে শক্তি প্রদান করে।মহিলাদের গর্ভাবস্থায় বেশি বেশি বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে।

ফাইবারঃ কলায় পরিমিত পরিমাণে ফাইবার থাকার কারণে এটি আমাদের হজমে সাহায্য করে। পাচনতন্ত্রের শক্তি বৃদ্ধি করে। শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে। পাকা কলা পাকস্থলীতে এসিডের পরিমাণ কমিয়ে গ্যাস্ট্রিক সমস্যা দূর করে। কাঁচা কলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ডায়রিয়া কমাতেও কাঁচা কলা ব্যবহার করা হয়।অনেকক্ষণ না ভক্ষণের ফলে পেটে এসিডিটি হয় যার ফলে আলসার হতে পারে।কলার মধ্যে থাকা উপাদান শরীরের অতিরিক্ত এসিড নিয়ন্ত্রণ করে আলাসারে সমস্যা প্রশমন করে ৷  তাই যাদের গ্যাস্ট্রিক আলসার কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া রোগীদের কলা খুবই উপকারী।এছাড়াও ফাইবার ওজন কমাতে সাহায্য করে।একটি কলা খেলে তা আমাদের পেট অনেকক্ষণ ভরা রাখে।ওজন কমাতে হলে পরিমিত পরিমানে কলা গ্রহণ করতে হবে।

কার্বোহাইড্রেটঃ কলায় কার্বোহাইড্রেট থাকার কারণে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। প্রতিটি কলায়  ৯০% ক্যালরি কার্বোহাইড্রেট থেকে পাওয়া যায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কে নিয়ন্ত্রণে রাখে প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ ।এটি শরীরের পরিপাক ব্যবস্থাকে উন্নত করে ডায়াবেটিস রোগীরা একটি প্রতিদিন একটি করে কলা খেলে তা রক্তে গ্লুকোজের  পরিমাণ বৃদ্ধি করবে।শর্করা জাতীয় উপাদান হওয়ায় কলার খোসা শরীরের মশার কামড়ের স্থানে ব্যবহার করলে প্রদাহ উপশম হয়।জীবানু সরিয়ে নেয়।

ভিটামিন বি১ ও বি৬ঃ কলায় থাকে ভিটামিন বি১ বি৬ যা হ্যাঙ্গওভার কমাতে সাহায্য করে এটি স্নায়ুগুলোকে শান্ত করে এছাড়াও এবং ইলেক্ট্রোলাইট কমাতে সহায়তা করে।

ভিটামিন সি ও ভিটামিন ১২ঃ কলায়  থাকে ভিটামিন সি ও ভিটামিন 12 রক্তস্বল্পতা কমায়।গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য রক্ষায় এই দুটি উপাদান খুবই সহায়ক।ভিটামিন  বি১২ খুব অল্প পরিমাণ থাকলেও কলায় থাকা আয়রন  এই অভাব পূরণ করে।ভিটামিন সি শ্বেতকণিকার উপাদানকে বাড়িয়ে দিয়ে শরীরে জীবাণু ধ্বংস করে।রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে।

ভিটামিন এঃ কলায় থাকা ভিটামিন এ চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে।চোখে ছানি পড়া ছত্রাক কমাতে ও কর্নিয়ার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে।কলা চোখকে কোনো ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রমণ থেকে দূরে রাখে।

ট্রিপটোফেন ও সেরোটোনিন ঃএই দুই উপাদান মানুষের বিভিন্ন  উদ্বেগ ও হতাশা দূর করে।সুখ হরমোন নামে পরিচিত ট্রিপটোফেন নিঃসরণের ফলে মন সবসময় হাসি খুশি থাকে। হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সেরোটোনিন মতিষ্কের রক্ত সঞ্চালনকে বৃদ্ধি করে।দৈনন্দিনের কাজের চাপে যখন বিরক্তি চলে আসে দৈনিক একটি করে কলা খাদ্য তালিকায় রাখলে এই হতাশা কিছুটা দূর করা যাবে।

মেলাটোনিন ঃ কলায় থাকা মেলাটোনিন উপাদানটি অনিদ্রার জন্য ব্যবহৃত হয়।যে রোগীরা ঘুমের সমস্যার ভুগছেন তাদের জন্য কলা হতে পারে একটি উপকারী ফল।

অ্যামিনো এসিডঃ কলায় থাকা অ্যামিনো এসিড  শরীরের শক্তি বাড়াতে ইতিবাচক ভুমিকা রাখে।শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখে।কঠোর পরিশ্রমের শক্তি যোগায়।শরীরের খারাপ উপাদানসমূহ বের করে দেয়।তাই কলা ব্যায়ামের পর খেলে এটি কার্যকারী ভুমিকা রাখে।

ত্বক,চুল,পা চোখ ও দাঁতের  যত্নে কলার উপকারীতাঃ 

ত্বক– যে কোনো ধরনের ত্বকের জন্য কলা উপকারী এটি ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখে। নিস্তেজ ত্বককে সতেজ করে তুলে।ত্বককে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। ত্বকের কুচকে যাওয়া সমস্যা রোধ সহ ত্বক টানটান করে।কলায় থাকা ভিটামিন সি ত্বকের মৃত কোষ গুলো সরিয়ে ত্বকের  জেল্লা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।ব্রণ সমস্যা দূর করে। কলার খোসা ত্বকের চুলকানী জাতীয় সমস্যা গুলোর সমাধান করে।

চুল– কলায় থাকা ফলিক এসিড চুল পরা রোধ করে।চুলকে করে ঘন ও স্বাস্থ্যউজ্জ্বল।চুলের শুষ্কতা রোধ করতে সাহায্য করে চুলকে চকচকে করে।তার জন্য কলার দিয়ে তৈরী স্কার্ব চুলে লাগানো প্রয়োজন।

পা– পায়ের গোড়ালী ফাটা ও রুক্ষ পায়ের গোড়ালী সতেজ করতে সাহায্য করে কলা।তাই গোড়ালী ফাটার সমস্যার যারা ভুগছেন তারা কলার খোসা  পায়ের গোড়ালীতে লাগালে এই সমস্যা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারেন।

চোখ–অনেক দীর্ঘ  সময়ের জন্য একনাগাড়ে কাজ করলে যখন আমাদের চোখের ফোলা ভাব তৈরি হয় ও চোখ মেলতে অসুবিধা হয় তখন একটি  কলার অর্ধাংশ লাগানো হলে কলায় থাকা পটাশিয়ামের সাহায্য দ্বারা  সেই ফোলা ভাব কিছুটা কমে আসে। চোখের রক্তনালিগুলোতে কিছুটা প্রশান্তি অনুভূত হয়।

দাঁত – কলা যেমন দাঁতকে শক্তিশালী করে তেমনি দাঁতের কালচে বা হলদে ভাবকেও দূর করে।দাঁতের প্রতি অযন্ত,ধূমপানের ফলে দাঁতের রঙ পালটে যায় কলার মধ্যে থাকা শক্তিশালী উপাদান দাঁতকে সাদা করে।

কলার ব্যবহার

কলার ব্যবহার খুবই সহজ।অনেক অঞ্চলের মানুষ সকালের খাবারে কলা,চিড়া, মুড়ি,গুড় দিয়ে খেতে ভালবাসে।এছাড়াও ডায়েট চার্টে সালাদ বানিয়ে,স্যান্ডউইচের মধ্যে অথবা বিভিন্ন ফলের সাথে মিক্সড করেও কলা খাওয়ার মজা নেওয়া যায়। কাঁচা কলা তারকারীতে রান্না করা হয়। কলার মোচা তরকারীতে দেওয়া হয়।কলার পাতা,খোসা গৃহপালিত পশুর খাদ্য।কলা গাছ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।
কলা ও কলার খোসার উপকারীতার জন্য কলা খাওয়া ছাড়াও অন্য ভাবে শরীরে ব্যবহার করা যায়। কলার সাথে মধু, চিনি,এলোভেরা,দুধ ইত্যাদির স্কার্ব বানিয়ে ত্বকে ব্যবহার করা যায়। কলার খোসা ত্বকে,চোখে,হাত পা,চুল ইত্যাদিতে লাগানো যায় ।

কলার অপকারিতাঃ

কলা যেমন উপকারী তেমনি এটি অতিরিক্ত গ্রহণ হতে পারে আপনার শরীরের জন্য কলা ক্ষতিকারক।

★কিডনি রোগী,ডায়াবেটিস রোগী, গর্ভবতী মহিলা, অতিরিক্ত এলার্জির সমস্যায় আক্রান্ত ইত্যাদি মানুষের জন্য অতিরিক্ত কলা গ্রহণ উপযুক্ত নয়।অতিরিক্ত শর্করা থাকায় খাবার পর মুখ না ধুলে দাঁতের সমস্যা হয়।

★উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম হতে পারে শরীরের জন্য ক্ষতিকর তাই দিন অতিরিক্ত কলা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। অতিরিক্ত কলা গ্রহণে হতে পারে হাইপারক্যালেমিয়া নামক রোগ।এই রোগ পেশীকে দূর্বল করে হৃদস্পন্দের সমস্যা ঘটাতে পারে।

★কলায় থাকা অ্যামিনো এসিড রক্তনালীর সমস্যা ও মাথাব্যথা বাড়ায়।ট্রিপটোফ্যান থাকায় অতিরিক্ত ঘুম হয়।

সবশেষে বলা যায় পরিমিত পরিমাণে কলা খেলে তা হতে পারে শরীরের জন্য খুব উপকারী অন্যথায় অপরিমিত কলা গ্রহণ নিয়ে আসে স্বাস্থ্যঝুঁকি তাই আমাদের কলার সকল গুণাগূন জেনে পরিমিত পরিমানে কলা খাবার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।নিঃসন্দেহে কলা আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় একটি উপযুক্ত সুষম খাদ্য।