ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কি? কর্মক্ষেত্রে EQ (পর্ব ২)

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগ জনিত বুদ্ধিমত্তা মানে হচ্ছে এমন দক্ষতা যা দ্বারা একজন ব্যাক্তি নিজের এবং আসেপাশের ব্যক্তিদের আবেগকে বুঝতে পারেন এবং আবেগ বুঝে তা ইতিবাচক ভাবে ব্যাবহার করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে বিভিন্ন সমস্যা থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে পারেন৷

আরো একটু সহজ ভাবে বললে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স হচ্ছে নিজেকে (নিজের আবেগ) বুঝা, বুঝে আবেগকে সঠিক পথে পরিচালিত করা, আসেপাশের মানুষের আবেগকে বুঝা, এবং সে আবেগকে বুঝে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে একটি দারুন সামাজিক এবং পেশাদারীক সুসম্পর্ক  বজায়ে চলা। এবং অন্যের আবেগকে বুঝে নিজের আবেগ প্রকাশ করা।

“ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স” নামে ডেনিয়েল গোলম্যান এর বইটি সর্বপ্রথম মানব সমাজকে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা EQ সম্বন্ধে ভাবাতে শুরু করে। আচ্ছা বলে নেই , EQ হচ্ছে  Emotional Quotient ।আবেগ কেন্দ্রীক বুদ্ধিমত্তাকে EQ দ্বারাও প্রকাশ করা হয় ।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স
ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কেন জরুরী?


ভারতীয় উপমহাদেশ তথা ভারত , বাংলাদেশ , পাকিস্তান সহ উন্নয়নশীল দেশ গুলোতে কর্মক্ষেত্রে এখন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ডিগ্রী , সার্টিফিকেট এবং IQ এর পাশাপাশি EQ অনেক গুরুত্বের সাথে দেখা হয় ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগ কেন্দ্রীক বুদ্ধিমত্তা কিভাবে বাড়াবো? কিভাবে EQ বৃদ্ধি পায়? এটি মূলত চার ভাগে ভাগ করা যায়। আপনি যদি এই চারটি বিষয় ভাল ভাবে আয়ত্ব করে চর্চা করতে পারেন তবে আপনি আপনার ইকিউ লেভেল বৃদ্ধি করতে পারবেন । বিষয় চারটি হচ্ছেঃ 

১। নিজেকে বুঝাঃ (Self-awareness)
২। নিজেকে পরিচালনাঃ (Self-management)
৩। পারিপার্শ্বিক ব্যক্তিদের বুঝাঃ (Social awareness)
৪। সম্পর্ক উন্নয়ন ও পরিচালনাঃ (Relationship management)


 
১। নিজেকে বুঝাঃ (Self-awareness) আপনি যদি নিজের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বৃদ্ধি করতে চান সবার আগে আপনাকে আপনার নিজের আবেগ বুঝতে মনযোগী হতে হবে। আপনাকে আপনার নিজের আবেগ গুলোকে বুঝতে এবং সেই আবেগ কিভাবে আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গুলোকে প্রভাবিত করে তা বুঝতে হবে। আবেগ কিভাবে আমাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে তা আপনি চাইলে আমাদের ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ১ম পর্বে লেখা ছোটগল্প দুটিতে পড়ে দেখতে পারেন।

আপনার আবেগ আপনার যেমন শক্তি হতে পারে তেমন অনিয়ন্ত্রিত আবেগ আপনার সবচেয়ে বড় শত্রুও হতে পারে। তাই নিজের মানসিক শক্তি এবং দুর্বলতা গুলো খুজে বের করতে হবে। আপনার কোন ইমোশোন গুলোর কারনে আপনি বার বার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করছেন সেগুলো খুজে বের করুন । দেখবেন আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।

২। নিজেকে পরিচালনাঃ (Self-management) প্রথমে তো নিজেকে বুঝলেন নিজের আবেগকে বুঝলেন , নিজের দুর্বলতা এবং শক্তি খুজে বের করলেন । এবার সেগুলোর উপর কাজ করতে হবে । দুর্বলতা গুলোকে শক্তিতে রুপানরিত করতে হবে।ধরুন,

আপনার এক কাছের বন্ধুর সাথে আপনার খুব সামান্য বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়ে কথা বলা বন্ধ , কিন্তু ইগোর কারনে কেউ আগে কথা বলতে চাইছেন না। এমন অবস্থায় আপনি এমন একটা সমস্যায় পরেছেন যেখানে সবচেয়ে ভাল সমাধান আপনার সে বন্ধুটিই দিতে পারতো ।কিন্তু এখানে সমাধান নিতে আপনাকে বাধা দিচ্ছে আপনার আবেগ । এখন আপনি যদি আপনার আবেগ কেন্দ্রীক বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে ইগো ভুলে তার সাথে আগে কথা বলা শুরু করেন তবেই আপনি ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কাজে লাগিয়ে নিজের কাজকে সহজ করে নিলেন।

অথবা ধরুন,  আপনাকে মানুষ একটু প্রসংসা করলেই আপনি খুশিতে গলে যান , এতটাই খুশিতে টগবগে হয়ে যান যে, কোন চতুর ব্যক্তি সে সুযোগে আপনার কাছে হাজার হাজার টাকা ধার চাইলেও দিয়ে দেন । একটু পর খুশি শেষ হলে মনে হয় , আরে! এর থেকে তো পাওনা টাকা ফেরত নেয়া খুব কঠিন । এর আগে ৭ দিনের কথা বলে ৭ মাস পর ফেরত দিয়েছিল !! এমন সব জায়গায় আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে , প্রশংসা থেকে প্রাপ্ত খুশি নিজেকে উৎফুল্ল করতে রাখুন, কিন্তু এর বেশি নয়।

৩। পারিপার্শ্বিক ব্যক্তিদের বুঝাঃ (Social awareness) নিজের আবেগ সম্বন্ধে বুঝার পর আমাদের আশেপাশের মানুষ গুলো , বিশেষ করে আমরা যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাই , যাদের কাজকর্ম এবং ব্যাবহার তাদের পাশাপাশি আমাদের জীবনেও প্রভাব ফেলে তাদের ইমোশন গুলোকে বুঝতে চেষ্টা করা ,তাদের সাথে ইম্পেথাইজড হওয়ার চেষ্টা করা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর একটি ভাগ । কারন আপনার মনের অবস্থা অনেক সময়ই আপনার আশেপাশের মানুষ দ্বারা পরিবর্তীত হয়ে যেতে পারে। একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেই,

ধরুন আপনার মন এখন অনেক ভাল বাসায় জোরে সাউন্ড দিয়ে গান শুনছেন , এমন সময় আপনার বড় ভাই বা বোন প্রচন্ড রোদে হেটে বাহির থেকে এসে ঘরে ঢুকেছে , আপনি সেটা দেখলেন কিন্তু আপনি চরম খুশিতে আছেন গান শুনে তালে তালে মাথা নাড়াচ্ছেন । আপনার অবস্থায় কোন পরিবর্তন আসলো না, সে বিরক্ত হয়ে আপনাকে একটি ধমক দিয়ে গানটি বন্ধ করে দিলো এবং আপনাদের মধ্যে এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়ে কয়েকদিন কথা বন্ধ ।

কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো যদি আপনি বুঝতে চেষ্টা করতেন প্রচন্ড রোদে হেটে বাসায় এসে তার মনের কি অবস্থা , বা আপনি নিজে এই রোদে হেটে বাসায় আসলে আপনার কতটা বিরক্ত লাগতো । সে চিন্তা করে আপনি যদি গানের শব্দ কমিয়ে দিয়ে তাকে এক গ্লাস পানি এনে দিতেন  পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো, সেও হয়তো খেয়াল করতো আপনি কোন কারনে অনেক খুশি । তখন হয়তো সেই খুশির বেপারটা নিয়ে কথা বলেতে বলতে তার রোদে হেটে এসে তৈরি হওয়া বিরক্তিও কেটে যেত।

৪। সম্পর্ক উন্নয়ন ও পরিচালনাঃ (Relationship management) ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এর সবচেয়ে ফলদায়ী ভাগ রিলেশান ম্যানেজমেন্ট । কারন আপনি নিজের আবেগ বুঝলেন , আসেপাশের মানুষের আবেগ বুঝলেন , সেগুলো নিয়ে কাজ করে যদি আশে পাশের মানুষের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরি এবং রক্ষা করে চলতে না পারেন তবে Eq ডেভলাপমেন্ট বৃথা রয়ে যাবে। আপনার সামাজিক, পারিবারিক এবং কর্মজীবনে  আবেগকেন্দ্রিক বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার জরুরী।

আপনার কর্মক্ষেত্রে আপনি যত বেশি EQ এর অধিকারী হবেন তত আপনার টিম লিডার হিসেবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদের কাজ করতে প্রভাবিত করা এবং অনুপ্রাণিত করতে আপনাকে আগিয়ে আসতে হবে। আপনি যদি আপনার টিমমেট দের মনের অবস্থা বুঝতে পারেন তবে তাদের সাথে কখন কি বলতে হবে , কখন কাকে কি বললে সে বেপারটা কিভাবে নিবে সেটাও বুঝতে পারবেন।

আপনার আসে পাশে আবস্থানরত মানুষদের আবেগ বুঝে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটা জরুরী। এটা কর্মক্ষেত্রে যতটা জরুরী পারিবারিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি জরুরী । বিভিন্ন পারিবারিক এবং দামপত্য সম্পর্কে ফাটল ধরে এই একে অপরের ছোট ছোট আবেগ জিনিত কনফ্লিক্টের কারনে ।হয়তো আপনি কারো সাথে হঠাৎ রাগ দেখিয়ে ফেললেন ,হতে পারে সে আপনার বন্ধু , অধীনস্থ কেউ বা পরিবারের কেউ । একটু পর অবশ্যই আপনাকে তার সাথে ভালভাবে কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে সরি বলতে হবে। কিছুতেই ইগোর কারনে পরিস্থিতি এমন রেখে দেয়া যাবেনা ।


জানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াঃ ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স (EQ) একটা চর্চালব্ধ জ্ঞান যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে পাওয়া কঠিন। আপনাকে সবসময় নতুন কিছু জানার মধ্যে থাকতে হবে। ইমোশনাল ইন্টেলিজিন্স বিষয়ক কিছু বই আছে যা আপনি পড়ে দেখতে পারেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ডেনিয়াল গোলম্যানের “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স” । অনলাইনে “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স”pdf আকারেও পাওয়া যায়। এছাড়া বাংলাদেশী লেখখ রুশদিনা খান এর “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স” এবং প্রফেসর মঈনুদ্দিন চৌধুরী  রচিত “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স” বই গুলো বিভিন্ন বুক স্টোর বা অনলাইন বুকস্টর রকমারি.কমে এবং বইবাজার.কমে পেয়ে যাবেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *